নতুন বন্দোবস্তের রাষ্ট্র বিনির্মাণে’ চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশ ঘটে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। এটি প্রতিষ্ঠিত করেছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সংগঠকদের একটি অংশ।
জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন আর আকাশচুম্বী প্রত্যাশার ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠা এই তরুণ নেতৃত্বের দল ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন আত্মপ্রকাশ করে, দেশের আপামর জনমানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার ঘটেছিল। মানুষ স্বপ্ন দেখছিল, পুরনো রাজনৈতিক পঙ্কিলতা ঝেড়ে ফেলে এনসিপি উপহার দেবে এক নতুন বাংলাদেশের।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যুত্থানের বছর না ঘুরতেই এবং আত্মপ্রকাশের মাত্র ছয় মাসেই সেই প্রত্যাশার চূড়া থেকে এনসিপি পা পিছলে পড়ছে বাস্তবতার খাদের কিনারায়। জুলাই অভ্যুত্থানে যে নাহিদ-সারজিস-হাসনাতদের দেখে মানুষের মনে স্বপ্ন জেগেছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা ক্রমেই ম্লান হয়ে এসেছে। বরং পদে পদে এখন এই তরুণ নেতারা হয় বিতর্কে জড়াচ্ছেন, নয়তো অপরিপক্কতায় খাচ্ছেন হোঁচট।
তবে দলের জন্মলগ্ন থেকেই সবচেয়ে বেশি আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। জুলাই অভ্যুত্থানে তার নেতৃত্ব, ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে সম্মুখসারির ভূমিকাই তাকে এনসিপির মুখপাত্রে পরিণত করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের অন্য নেতাদের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যখন জনগণের হতাশা বাড়ছে, তখন নাহিদের পরিপক্কতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিই এখন এনসিপির অন্যতম ভরসা।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নাহিদ ইসলাম ফ্যাসিস্ট হাসিনাসহ তার ফ্যাসিবাদ হটানোর এক দফা ঘোষণা করেন। সেই উত্তাল সময়ে নাহিদ ইসলাম ও তার সহযোদ্ধা ছাত্রনেতাদের ডাকে সাড়া দিয়ে আপামর জনতা রাজপথে নেমে আসে। ৫ আগস্টের সফল অভ্যুত্থানের পর বন্যাসহ একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েও তারা বিপুল সাড়া পান জনগণের। এই ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করেই গড়ে ওঠে এনসিপি।
এনসিপির আত্মপ্রকাশের দিন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, “বাংলাদেশকে আর কখনো বিভাজিত করা যাবে না। এনসিপি হবে গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল। ” যদিও ইতোমধ্যেই এনসিপির বেশ কিছু নেতা-কর্মীর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড জনমনে তীব্র হতাশার সৃষ্টি করেছে।
দল গঠনের শুরুতেই যুগ্ম-সদস্য সচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর জেলা প্রশাসক নিয়োগে অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং এনসিটিবির কাগজ সরবরাহে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে বিতর্কে জড়ান। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় যুগ্ম-আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এক নারী সতীর্থকে অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগে শোকজ নোটিশ পান। চলতি বছরের ২১ মে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন নেতাকে ধানমন্ডি থানা থেকে ছাড়িয়ে আনায় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদও ব্যাপক সমালোচিত হন।
গুলশানে সাবেক এক এমপির বাসায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়কের চাঁদাবাজির ঘটনাতেও এনসিপির কোনো কোনো নেতার নাম উঠে আসে। এনসিপি গঠনের শুরুর দিকে উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম শতাধিক গাড়ি নিয়ে এলাকায় শোডাউন দিলে তার আর্থিক উৎস নিয়ে সব মহলে প্রশ্ন ওঠে। দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের প্রসঙ্গে সেনাবাহিনীর নাম টেনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেন। নানা সময়ে নানা বক্তব্য এবং সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েও তিনি বিতর্কে আসেন।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গত ১৯ জুলাই কক্সবাজারের এক পথসভায় বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদকে ইঙ্গিত করে ‘ভারতের শিলং থেকে আসা নব্য গডফাদার’ মন্তব্য দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় তোলে। এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এনসিপির পদযাত্রায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে
গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদ পতনের বর্ষপূর্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণা করার দিনই এনসিপির শীর্ষ ৫ নেতা- হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, ডা. তাসনিম জারা ও খালেদ সাইফুল্লাহর কক্সবাজারে ব্যক্তিগত সফরে যান। এ নিয়েও জনমনে প্রশ্ন ওঠে এবং এনসিপির পক্ষ থেকে তাদের শোকজও করা হয়।
সবশেষ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে জাতীয় যুব সম্মেলনের অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না। ’ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি শুরু করেছে, তখন এই ধরনের মন্তব্য নানা আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকে মনে করছেন, এই বক্তব্য নির্বাচনের পেছানোর ইঙ্গিত বহন করে।
এনসিপির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তাদের নিজস্ব কোনো সুনির্দিষ্ট মতাদর্শ বা নীতি স্পষ্টভাবে দেখা যায় না, বরং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ বিরোধিতাই দলটির মূল এজেন্ডা হিসেবে সামনে এসেছে। দলটির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আছে জামায়াতে ইসলামী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার। একদিকে যেমন তাদের সরকারের ‘কিংস পার্টি’ বলে কেউ কেউ আখ্যা দেন; অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তাদের অতিরিক্ত সখ্যও কেউ কেউ সন্দেহের চোখে দেখেন।
দলের অন্যান্য নেতা-কর্মীদের ঘিরে যখন বিতর্ক আর সমালোচনার মেঘ ঘনীভূত, তখন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ‘ক্লিন ইমেজ’ এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। তার বক্তব্যে এখনো সরলতা, পরিপক্কতা এবং দেশকে নতুন করে গড়ার পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতির লক্ষণ দেখতে পাওয়া যায় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে ডিবির হাতে আটক হওয়া নাহিদ ইসলাম অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, দেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করতে তার ভূমিকা ছিল সম্মুখসারিতে। ফ্যাসিবাদের পতনের পর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন, কিন্তু দেশের স্বার্থে, দেশকে নতুনভাবে গড়ার লক্ষ্যে উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করে রাজনৈতিক দলের হাল ধরেন। এতেই মানুষ আশার আলো দেখেছিল।
নাহিদ ইসলাম এখনো রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে দৃঢ় রয়েছেন, যার প্রতিফলন দেখা যায় তার প্রতিটি বক্তৃতায়। জুলাই মাসে ৬৪ জেলায় নাহিদ ইসলাম দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি’ শুরু করেন। এ সময় তিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে যান, তাদের কথা শোনেন এবং পুরনো জরাজীর্ণ অবস্থা থেকে দেশকে একটি নতুন বন্দোবস্তে নিয়ে যেতে নিজের দলের অবস্থানও জানান। এতে প্রায় এক বছর পর জনগণের সঙ্গে তাদের জনসংযোগ ঘটে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে দেশের প্রতিটি জেলায় পদযাত্রা করার পরও নির্বাচনের ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর মতো তাদেরও অনীহা প্রকাশ পেয়েছে নানা সময়। একদিকে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো যখন দ্রুত নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে নাহিদ ইসলাম এবং তার দলের নেতারা বারবারই স্পষ্টভাবে জানাচ্ছেন, সংস্কার ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের ব্যাপারেও যেনতেন একটি সনদ তৈরি করার পক্ষে নন নাহিদ। বরং এই সনদকে আইনি ভিত্তি দেওয়ারও দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন তিনি এবং তার দল এনসিপি। এছাড়া পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচারের ব্যাপারেও নাহিদ ইসলাম বরাবরই সরকারকে দ্রুততার সঙ্গে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে দাবি জানিয়ে আসছেন।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, দলের অন্যদের তুলনায় নাহিদের বক্তব্য বেশ পরিপক্ক এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারপূর্ণ। সংশ্লিষ্টরা বিশ্বাস করেন, তিনি শুধু জুলাই অভ্যুত্থানে সম্মুখসারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্বই দেননি, বরং এই গণঅভ্যুত্থানকে এখনো বুকে ধারণ করে যাচ্ছেন। র প্রমাণ পাওয়া যায় তার বক্তব্যেও। তবে দেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ও বিকল্প শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে হলে শুধু একা নাহিদ ইসলামের ওপর ভরসা করে এনসিপির রাজনীতি টিকে থাকবে বলে মনে করছেন না রাজনৈতিক বোদ্ধারা। তারা মনে করছেন, নাহিদ ইসলামের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও তার নীতিগত দৃঢ়তা এখনো এনসিপির জন্য একটি বড় শক্তি। কিন্তু রাজনীতির মাঠে লম্বা দৌড়ে টিকতে হলে দলকে সঠিক পথে পরিচালিত করার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকাটাও জরুরি বলে তারা অভিমত দিচ্ছেন।